কয়েক বছরের অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও নীতিগত অনিশ্চয়তার পর চীনের পুঁজিবাজারে ফের বিদেশী বিনিয়োগের জোয়ার দেখা যাচ্ছে। গত জানুয়ারি-অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে দেশটির মূল ভূখণ্ড ও হংকং মিলিয়ে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের হার চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিষয়টিকে চীনা বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরার ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচনা করছেন বিশ্লেষকদের একটি অংশ। তারা বলছেন, একসময় ‘অবিনিয়োগযোগ্য’ বিবেচিত এ বাজার নিয়ে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা নতুন করে ভাবছেন। খবর এফটি।
গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) প্রতিবেদন অনুযায়ী চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে চীনা মূল ভূখণ্ড ও হংকংয়ে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারে বিদেশী বিনিয়োগ প্রবাহ ছিল ৫ হাজার ৬০ কোটি ডলার, যা ২০২৪ সালের একই সময়ের ১ হাজার ১৪০ কোটি ডলার বিনিয়োগ থেকে অনেক বেশি।
মূল ভূখণ্ড চীন ও হংকং উভয় বাজারে চীনা কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে মূল ভূমিকা রাখছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে নতুন উচ্ছ্বাস। বিশেষ করে এআই চ্যাটবট ডিপসিক প্রকাশের পর বিনিয়োগ আগ্রহ দ্রুতগতিতে বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হংকংয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) শক্তিশালী প্রবাহ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চীনের শেয়ারবাজার থেকে বিনিয়োগ রিটার্ন সন্তোষজনক ছিল না। ওই সময়ে দেশটির অর্থনৈতিক মন্থর গতির আশঙ্কা এবং ওয়াশিংটন-বেইজিং উত্তেজনা বৃদ্ধিও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছিল।
বৈশ্বিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংস্থা ফেডারেটেড হার্মিসের জাপান বাদ দিয়ে এশিয়া ইকুইটি বিভাগের প্রধান জোনাথন পাইন্স বলেন, ‘বিশ্বের বাকি অংশের তুলনায় এখনো রেকর্ড ডিসকাউন্টে ট্রেড করছে চীনা বাজার। অথচ তাদের প্রযুক্তি খাতে অনেক দুর্দান্ত কোম্পানি আছে। কিছু ক্ষেত্রে তারা যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী।’
কোনো শেয়ার, সূচক বা বাজারে তার প্রকৃত মূল্য বা অনুরূপ অন্য বাজারের তুলনায় কম দরে লেনদেন হওয়াকে ডিসকাউন্ট ট্রেডিং বলা হয়। এর কারণ হলো রাজনৈতিক ঝুঁকি, অর্থনৈতিক ধীরতা, বিনিয়োগ আস্থার অভাব এবং কোনো খাতে বা দেশের প্রতি দীর্ঘ সময়ের নেতিবাচক মনোভাব।
২০২১ সালে চীনের পুঁজিবাজারে বিদেশীদের লেনদেন রেকর্ড ৭ হাজার ৩৬০ কোটি ডলারে পৌঁছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ঊর্ধ্বগতি সত্ত্বেও ২০২৫ সালের পুরো বছরে চীনের শেয়ারবাজারে বিদেশী বিনিয়োগ এর নিচেই থাকবে। তবু এটি কয়েক বছরের ধারাবাহিক পতনের পর সুস্পষ্ট পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আলপাইন ম্যাক্রোর উদীয়মান বাজার ও চীন বিষয়ক স্ট্র্যাটেজিস্ট ইয়ান ওয়াং বলেন, ‘দুই বছর আগেও চীন অনেকের কাছে বিনিয়োগের অযোগ্য ছিল।’
এর আগে হংকংয়ের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ড চীনে বিনিয়োগের দৈনিক তথ্য প্রকাশ হয়ে এলেও গত বছর তা বন্ধ করে দেয় বেইজিং। এতে দেশটিতে বিদেশী বিনিয়োগ পরিমাপ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে চীনে বাইরে থেকে কত অর্থ ঢুকছে বা বেরোচ্ছে সে তথ্য বিশ্লেষণ করে সামগ্রিক প্রতিবেদন তৈরি করে থাকে আইআইএফ। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে তালিকাভুক্ত আলিবাবার মতো চীনা কোম্পানিতে লেনদেন অন্তর্ভুক্ত থাকে না।
বিনিয়োগ সংস্থা ফিডেলিটি ইন্টারন্যাশনালের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বিনিয়োগ বিভাগের প্রধান স্টুয়ার্ট রাম্বল বলেন, ‘চীনা শেয়ারে এ বছরের শক্তিশালী পারফরম্যান্সের বড় অংশের উৎস স্থানীয় রিটেইল বিনিয়োগকারীরা।’
চলতি বছর চীনের মূল ভূখণ্ডের বিনিয়োগকারীরা হংকং শেয়ারবাজারে রেকর্ড ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন হংকং ডলার বা ১৬ হাজার ৮৭০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। এটি অঞ্চলটির স্টক এক্সচেঞ্জের মোট লেনদেনের প্রায় ২০ শতাংশ।
সাম্প্রতিক বছরে সম্পত্তি খাতের মন্দা, বেসরকারি ব্যবসা খাতে ক্রমবর্ধমান বিধিনিষেধ এবং ক্রমেই তীব্র হয়ে ওঠা মার্কিন-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে সতর্ক হয়ে ওঠেন বিদেশী বিনিয়োগকারীরা। সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে চীনের পুঁজিবাজার। বিএনপি পারিবাসের অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের চিফ মার্কেট স্ট্র্যাটেজিস্ট কৌশলবিদ ড্যানিয়েল মরিস বলেন, ‘একসময় মানুষ চীন নিয়ে কথা বলতেই চাইত না। এখন আমরা এখানকার বাজার নিয়ে অনেক কথা বলি।’
বেসরকারি খাতে বেইজিংয়ের বিধিনিষেধের সাম্প্রতিক উদাহরণ হলেন আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা। বিশ্লেষকরা বলেন, চীনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে টানাপড়েনে তার ব্যবসায়িক পতন বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় আঘাত দিয়েছিল। তবে নীতিনির্ধারকরা বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে আস্থার সংকট কাটাতে তৎপর হয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে এর সুফলও দেখা যাচ্ছে।
অবশ্য চীনা শেয়ারবাজারে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস, ইন্ডিয়ানা ও অন্যান্য অঙ্গরাজ্যের পেনশন তহবিল এখনো চীনা কোম্পানি থেকে তাদের বিনিয়োগ তুলে নেয়া অব্যাহত রেখেছে। কারণ চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা। আবার মার্কিন পুঁজিবাজার রেকর্ড উচ্চতায় থাকলেও একমুখী নির্ভরতা কমাতে কিছু বিনিয়োগকারী চীনের প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী। আলিবাবার মতো অনেক চীনা কোম্পানির শেয়ার এখনো পূর্ববর্তী সর্বোচ্চ স্তরের নিচে রয়েছে এবং একই খাতের মার্কিন কোম্পানির শেয়ারের তুলনায় কম দরে লেনদেন হচ্ছে। অর্থাৎ ডিসকাউন্ট ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহকদের আগ্রহী করতে চাইছে।